অচেনা মনের খোঁজে – সপ্তদশ পর্ব।

by Tamali


“কেমন আছেন অভ্রদীপ?কতদিন আমার খোঁজ নেননি।রাগ করেছেন আমার ওপর?”অচেনা নম্বর থেকে হোয়াটস অ্যাপে মেসেজ টা পেয়ে অবাক হলেও চমকালোনা অভ্র।যদিও নম্বরটা অচেনা,আর ডিপি তেও একটা বাচ্ছার ডাউনলোড করা ছবি,কিন্তু বুঝতে পারলো এটা অনন্যার নম্বর।তাছাড়া এরকম ভাবে আর কেউ ওকে এধরণের কথা বলবেনা।এতদিন ওর মোবাইল নম্বর অভ্র চায়নি,অনন্যাও দেয়নি।আজ এতমাস পরে ও নিজের নম্বর দেওয়ায় খুশি হওয়ার সাথে সাথে একরাশ অভিমানও ঘিরে ধরলো ওকে।অনন্যা বলবে বলেও ওকে নিজের মনের কথা না বলায় এতদিন অনেকটা অভিমানেও ওকে ফোন করেনি।কিন্তু এই সময়ে ওর মনে কোনো চাপ সৃষ্টি করা ঠিক না বলে অভ্র সঙ্গে সঙ্গে রিপ্লাই দেয়।”মনে হচ্ছে আমি বুঝতে পেরেছি কে মেসেজটা করেছেন,তাও নাম টা বললে কথা বলতে সুবিধা হয়,কারণ ডিপি দেখেও তো কিছু বোঝা যাচ্ছেনা।”প্রায় দশ মিনিট পর উত্তর আসে,”আমি অনন্যা,অনন্যা চ্যাটার্জী।”

“রাগ কেন করবো?আসলে কদিন কাজের ভীষণ চাপ ছিল,তাই ফোন করা হইনি।আপনি এখন কেমন আছেন?পুচকু ঠিকঠাক আছে তো?”অভ্র দেরি না করেই কাজের ফাঁকে উত্তর দেয়।ওদিক থেকে আর সেভাবে কোনো উত্তর আসেনা।অনেক্ষন ফোনটা হাতে ধরে অপেক্ষা করে ফোনটা নামিয়ে পাশে রেখে কাজে মন দেওয়ার চেষ্টা করে অভ্র।কিন্তু মন আর বসতে চায়না।বারবার মনে হতে থাকে অনন্যা নম্বরটা দেবে বলেই মেসেজ করলো।কিন্তু কেন? ও কি কিছু বলতে চাইছে?নাকি সবাই মিলে ওকে খালি ব্যবহার করছে?চিন্তায় কেমন পাগল পাগল লাগে ওর।শেষদিন অনন্যার শ্বশুরবাড়িতে ওর শ্বশুর শাশুড়ির ব্যবহার মোটেই ওর ভালো লাগেনি।হ্যাঁ সমাজের ভয় ঠিক আছে,কিন্তু দরকারে অদরকারে রাত বিরেতে ফোন করার সময় এগুলো ভাবেনি,আর বাড়িতে গল্প করতে দেখেই সমাজকে মনে পড়ে গেলো?আর অনন্যা হঠাৎ হঠাৎ ফোন মেসেজ করে ডিসটার্ব করবে,তারপর ভুলে যাবে।হয়তো বাচ্ছাটা হয়ে গেলে ওকে কেউ মনেও রাখবেনা।অথচ অভ্র বেশি টান অনুভব করে বাচ্ছাটার জন্যেই।অভ্র প্রথম থেকে সচেতন ভাবে এড়াতে চাইলেও জড়িয়ে গেছে,কিন্তু দরকার ফুরোলে যদি ওরাই ওকে কেটে ফেলে দেয়?যদি ঐ পুচকেটার জন্যে মন কেমন করলেও পরে যেতে না পারে যখন তখন…এসব ভেবেই ও এখন থেকে চেষ্টা করছে দূরত্ব বাড়ানোর।প্রথম যখন ডাক্তার চৌধুরী সাহায্য চান অনন্যার চিকিৎসার জন্য,তখন ও প্রেগন্যান্ট কেউ জানতোই না।অভ্র সম্মতি দেওয়ার সময় ভেবেছিল অনন্যা সুস্থ হলে এমনি ওকে মনে রাখবেনা,আর অভ্র নিজে তো কোনো ভাবেই পরে আর জড়াবে না।কিন্তু ওই বাচ্ছাটা…রবি হয়ে অনন্যার পেটে হাত রেখে ও একদিন অনুভব করেছিল ওই ছোট প্রানটার অস্তিত্ব।অনন্যা নিজে ওর হাতটা নিজের পেটের উপর চেপে ধরে দেখিয়েছিল,তখন সবে নড়াচড়া অনুভূত হতে শুরু করেছে,তাও খুব মাঝে মধ্যে।এখন নিশ্চই সব সময় বোঝা যায় ওর লাফালাফি…ইস কি অদ্ভুত অনুভূতি!একটা বাচ্ছা ছেলে বা মেয়ে নয়,তার অস্তিত্বেই সবাইকে আনন্দে ভরিয়ে রাখে,এখনো মেয়ে হলে লোকে মন খারাপ করে!!!কি করে?হ্যাঁ সদ্য সন্তান হারানো মা ছেলের ফেরার আসায় এসব ভাবছে ঠিক আছে,কিন্তু এই প্রানটা তো রবি যাওয়ার আগেই তৈরি হয়েছে এটা কেন তারা ভুলে যাচ্ছে! কে জানে এখন কি অবস্থা ও বাড়িতে,এখনো কি ওইসব বলে অহেতুক চাপ তৈরি করা হচ্ছে?বুঝতে পারেনা অভ্র।আর বেশি ভাবতেও ইচ্ছা করেনা।জোর করে মনটা ঘুরিয়ে কাজে মনোনিবেশ করার চেষ্টা করে।
অনন্যা অভ্র কে হোয়াটস অ্যাপ করেছিল এলোমেলো চিন্তা থেকে,বলতে চাইছিল অনেক কিছু।বলতে চাইছিল ওর ভয়ের কথা,বলতে চাইছিল বাচ্ছাটার কথা।আজকাল ওর মাথায় অদ্ভুত চিন্তা ঢুকেছে,যদি মেয়ে হয় আর ও নিজে না থাকে তাহলে বাচ্ছাটার কি হবে?ওর শাশুরিমা কোনোভাবেই যে তার দায় নেবেনা এই কমাসে ও ভালো করে বুঝে গেছে।ও বেঁচে থাকলেও ঠিক কিছু একটা হয়ে যাবে,কিন্তু ইদানীং ওর মনে একটা মৃত্যু ভয় ঢুকেছে।প্রেগন্যান্ট অবস্থায় খুশির সাথে সাথে অনেক মেয়ের অবচেতনেই এই ভয়টা থাকে।হয়তো অমূলক,তাও ভাবে,আর সবার আগে ভাবে অনাগত সন্তানের কথা।অনন্যা পারেনা অভ্র কেও মনের কথাটা বলতে।শেষে সব সরিয়ে রেখে নিজের প্রিয় ডাইরিটা খুলে বসে।লিখতে শুরু করে নিজের কথা,আর ওই ছোট্ট প্রানটার ভবিষ্যতের কথা।লেখার সাথে আবেগের অদ্ভুত এক যোগ আছে,ডাইরির পাতায় ফোঁটা ফোঁটা চোখের নোনা জল এসে পড়ে,আর পেটের মধ্যেটা তোলপাড় হতে থাকে।
নিজের ঘরে লেখালিখির ছোট টেবিলটার সামনে বসে ভারী পেপার ওয়েটটা টেবিলে ঘোরানোর চেষ্টা করেই যাচ্ছেন অনির্বাণ।কাল রাতেও ভালো ঘুম হয়নি।আজ রাতটা কখন আসবে সেই আশায় অপেক্ষা করে আছেন,উনি জানেননা আজ রাতের পর জীবনের কোন পরিবর্তন হবে কি না,তাও ‘আশায় মরে চাষা’।কাল কিকরে সবটা মৃন্ময়ীকে বলতে পারলেন নিজেও জানেন না।শুধু মনে আছে ওনার কথা শুনে অবাক হয়ে তাকানো মৃন্ময়ীর মুখটা,চোখে হাজারটা জিজ্ঞাসা নিয়ে ও  চুপ করে ছিলো।সারারাত বারবার ফিরে এসেছে ওই সময়টা।”স্যার আপনি কি দিশা’র কথা ভেবে এত বড় কথাটা বলছেন?”একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে কথার শেষে,সাথে অনেকটা বিশ্বাসের অভাবও।অনির্বাণও কম অবাক হননা।হতাশ গলায় বলেন,”আমায় কি এতোটাও স্বার্থপর মনে হয় মিনু?ভালোবাসা না থাকলে শুধু স্বার্থের কারণে বিয়ে করতে চাইবো?তোমায় কি আগে বলিনি আমার মনের কথা!বাবা মা কে ছোটবেলায় হারিয়ে স্নেহ ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত ছেলেটার কথা কি তোমার কিছু জানা নেই?”তারপর একটু থেমে বলেন,”তবে আমি জানিনা তোমার মনে কি আছে?ভালোবাসা শ্রদ্ধা স্নেহ ছাড়া কোনো সম্পর্কই টেকে না,তাই তোমার অনুভূতিটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।এই উভয় পক্ষের অনুভূতিটা মেলেনি বলেই আমিও একদিন প্রত্যাখ্যান করেছিলাম কাউকে,কারণ সত্যি ভালো না বেসে তাকে মিথ্যে বলতে পারিনি,কিন্তু তার চোখ বলেছিল সে আমায় ভালোবেসেছে।তাই এতদিন ধরে অপেক্ষা করেছি তোমার উত্তরের।আজ অবধি বুঝতে পারিনি আমার লেখা কোনো চিঠি তুমি পেয়েছিলে কিনা,যদিও আমায় বাঁচিয়েছিলে তুমি,তাই আশা ছিল তুমি জেনেছো আমার কথা।…আজ আর ধৈর্য্য রাখতে না পেরে রাত জাগা ক্লান্ত শরীরটা টেনে তোমার কাছে চলে এলাম।…আচ্ছা তুমি কি করে বুঝে গেলে আমার মুখ দেখে যে আমার খুব তেষ্টা পেয়েছে?”বাচ্ছা ছেলের মতো অনির্বাণ প্রশ্ন করেন।একটু হকচকিয়ে যায় মৃন্ময়ী।এতক্ষন ঘরের একমাত্র চেয়ারটায় বসে দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে ও ডাক্তার চৌধুরীর কথা শুনছিলো।এই প্রশ্নের উত্তরে নড়েচড়ে বসলেও মুখে কিছু বলেনা।মনে মনে বলে,’সেই কবে থেকেই তো আপনার মুখ দেখে বুঝে যাই কখন কি প্রয়োজন আপনার।এ আর নতুন কি?কিন্তু আপনার ভালোবাসা সেভাবে কেন যে বুঝতে পারিনা।ভয় হয় ,হয়তো আমার ওপর নির্ভরশীলতা কে আপনি ভালোবাসা বলে ভুল করছেন।আমি যে, কোনো সমঝোতা দিয়ে সম্পর্ক শুরু করতে চাইনা।’কিছুক্ষন চুপ করে থেকে নিজের মধ্যে নিজেকে গুছিয়ে নিতে চেষ্টা করে মৃন্ময়ী।কিন্তু কোথাও যেন বিশ্বাসটা এসেও আসেনা।বুঝতে পারে কিছুটা সময় দরকার নিজেকে বুঝতে।ডাক্তার চৌধুরী তো নিজেকে মেলে ধরলেন,কিন্তু মৃন্ময়ীর মধ্যেটা এত সহজে ধরা দিতে দেবে না মৃন্ময়ী কে।মৃন্ময়ীর ভালোবাসা তো আজকের নয়,অনেক দিনের তিল তিল করে জমানো।তাই তাতে শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার সাথে কিছু অভিমানও মিশে আছে,যে অভিমান ওকে অনির্বাণ কে বিশ্বাস করতে বাধা দিচ্ছে,কিন্তু বিশ্বাসই আসল স্তম্ভ ভালোবাসার।তাই অনির্বাণের ভালোবাসাটা উপলব্ধি করতে ওর কিছুটা সময় দরকার,অন্তত একদিন।ও শুধু বলে,”আমায় কিছুটা সময় দিন স্যার।আমি ভালো করে চিন্তা করার অবস্থায় নেই।আমি কাল আপনাকে জানাবো আমার মন আমায় কি বললো।…ভেবেছিলাম কাল থেকে দিশা যাবো,কিন্তু এখন মনে হচ্ছে কাল দিনটা থাক।আমি কাল রাতের দিকে আপনাকে ফোন করবো।যদি মা কে ছেড়ে দেয় কাল তাহলেও করবো”।অনির্বাণ কোনো জবাব দেননি তারপর।চুপচাপ উঠে চলে এসেছিলেন।মৃন্ময়ীর উত্তর কি হবে উনি ভাবতেও চাননি,নিজের কথাটা সরাসরি বলার পর ভিতর থেকে অনেকটাই হালকা লাগছিলো নিজেকে।এটাও হয়তো বুঝেছিলেন মৃন্ময়ীর মতো আত্মসম্মানী মেয়ে এক কথায় হ্যাঁ বলবে না,সেটা হলে হয়তো অনির্বাণও অবাক হতেন।উনি রুচির ঘটনার সময় থেকে বুঝেছিলেন মৃন্ময়ীর মনে কোথাও হলেও ওনার জন্যে বিশেষ একটা জায়গা আছে,তাই ওই সময়ের পর থেকে অভিমানও তৈরি হয়েছে।নিক ও যতটা সময় চায় নিক,নিজেকে বুঝুক,অনির্বাণের ভালোবাসা উপলব্ধি করুক।তারপর ও যা সিদ্ধান্ত নেবে অনির্বাণ কোনো প্রশ্ন করবেনা।কিন্তু ওখান থেকে বেরিয়ে আসার সময় ভাবনাটা যতটা সহজ ছিল,রাত বাড়ার সাথে সাথে তা আর থাকলনা।যদি মৃন্ময়ী ফিরিয়ে দিত সেটা হয়তো অনেক সহজ হতো,কিন্তু মাঝের এই সময়টা আরো উৎকণ্ঠার হয়ে গেল।যত সময় এগোতে লাগলো উৎকণ্ঠা বাড়তে লাগলো।এ যেন ছোটবেলায় পরীক্ষার রেজাল্ট বেরোনোর আগের দিনের মতো।কিন্তু মৃন্ময়ী কি এই উৎকণ্ঠা টুকু দেওয়ার জন্যেই এই সময়টা নিলো?!!দূর!এসব চিন্তা থেকে বেরোতেই হবে।টেবিল ছেড়ে উঠে পড়লেন অনির্বাণ।ভাবলেন দিশা চলে যাওয়াই ভালো।কাজের মধ্যে অন্তত সময় কেটে যাবে।অন্যমনস্ক ভাবে তোয়ালেটা টেনে নিয়ে স্নানের ঘরে ঢুকে গেলেন ডাক্তার চৌধুরী।
মৃন্ময়ী আগের রাতে জেগেও পরের রাতটা ভালো করে ঘুমোতে পারেনি।একে হাসপাতালে মা কে রেখে এসেছে তার চিন্তা,অন্যদিকে দিনের শেষে ডাক্তার চৌধুরীর হঠাৎ আগমন,আর ওই কথাগুলো এই মুহূর্তে তো একদমই প্রত্যাশিত ছিলোনা মৃন্ময়ীর কাছে।মৃন্ময়ীর ভালোবাসা শুরু হয়েছিল শ্রদ্ধা দিয়ে,তারপর আপনভোলা কাজ পাগল মানুষটার প্রতি জন্মেছিল স্নেহ।তাঁর সৌম্য রূপটাকে ভালোবেসেছিল কাছাকাছি থাকতে থাকতে।কিন্তু সম্পর্কের জোর যখন জন্মাতে শুরু করেছে তখন রুচি সাহার ঘটনা মনে অভিমানের মেঘ জমাতে শুরু করে।পরে যখন বোঝে ওটা ভুল ধারণা ছিল তখন ওই অভিমান অন্য আকার নেয় …ওকে সামনাসামনি কিছু না বলে,ওর মন না বুঝে ডাক্তার চৌধুরীর কাপুরুষের মতো আত্মহত্যা করতে যাওয়া ও আজও মানতে পারেনা।এতদিন,প্রায় একমাস পর অনির্বাণ চৌধুরী ওর কাছে ছুটে এসেছে।কিন্তু মৃন্ময়ী কিছুতেই এখন মন থেকে আর তৈরি নেই,তৈরি নেই সব টুকু দিয়ে অনির্বাণ কে ভালোবাসতে,ওনাকে বিয়ে করতে।যে ব্যক্তিত্ব,যে আত্মবিশ্বাস দেখে ও মানুষটাকে ভালোবেসেছিল আজ তার কিছুই ও খুঁজে পায়না।ও ওই ভেঙে পরা পরনির্ভরশীল মানুষটাকে ভালোবাসতে চায়না।ওর প্রিয় মানুষটাকে ও খুঁজে বেড়ায়।সারা জীবন নিজের লড়াই লড়া মৃন্ময়ী যে কারোর আশ্রয় হতে চায়না, আশ্রয় পেতে চায় কারোর বুকে।সব মিলিয়ে ওর মন দুভাগ হয়ে যায়।এক ভাগ বোঝায় অনির্বাণ ওকে ভালো না বাসলে আগের রাতে সারাক্ষন ওর পাশে থাকতোনা,বা আজ রাতে এভাবে ছুটে আসতো না।ওদের ভালোবাসাহীন জীবন একে অপরের পরিপূরক।অন্যদিকে অন্য অংশটা ওইসব নেতিবাচক কথা বোঝায়।
আসলে লড়তে লড়তে একতরফা দেখতে দেখতে মৃন্ময়ীর চিন্তায় একটা ফাঁক তৈরি হয়ে গেছে।স্বামী স্ত্রী যে কখনো আশ্রয় দেয়,আর কখনো আশ্রয় পায় এটাই ও ভেবে উঠতে পারেনি।মানসিক ভাবে দৃঢ় ব্যক্তিও যে তার আপনজনের কাছে দরকারে আশ্রয় খুঁজতে পারে এটাই ও কোনোদিন উপলব্ধি করেনি।মা বাবার সম্পর্ক না দেখার জন্যে স্বামী স্ত্রীর প্রকৃত সম্পর্ক ওর অদেখাই থেকে গেছে।ডাক্তার অনির্বাণ চৌধুরীর অতীত তাঁকেও যে তাড়া করে এদিকটাই সাইকোলজিস্ট মৃন্ময়ী প্রেমিকা হয়ে ভুলে যায়।অভিমানের নিচে হয়তো ভালোবাসা চাপা পড়ে যায়।মৃন্ময়ী অনেক অনেক আগে সমাজের কথার হাত থেকে বাঁচতে কাঠিন্যের যে আবরণ তৈরি করেছিল সেটা আজ ওর প্রকৃত মনকেও মুড়ে দিতে তৎপর হয়ে ওঠে।সারারাত উল্টোপাল্টা চিন্তা করতে করতে ভোর রাতে ঘুমিয়ে পড়ে মৃন্ময়ী,যখন ঘুম ভাঙে ভালো রোদ উঠে গেছে।তাড়াতাড়ি করে উঠে তৈরি হয়ে মায়ের কাছে হাসপাতালে ছোট।তমশা লক্ষ্য করেন মেয়ে আজ ভীষণ অন্যমনস্ক,চোখের নিজের কালিটা যে তার জন্যে চিন্তা করে রাতে না ঘুমিয়ে পড়েছে বুঝতে পারেন।আজ থেকে দিশা যাওয়ার কথা ছিল,তাই স্বভাবতই মেয়ের মুখের উজ্জ্বলতা আশা করেছিলেন।কিন্তু মেঘে ঢাকা মুখটা তাকে চিন্তায় ফেলে,”মিনু কি হয়েছে তোর?কাল রাতে ঘুমোসনি?আজ দিশা যাবিনা?”মায়ের কথায় মৃন্ময়ী একটু থমকায়।মা সুস্থ থাকলে মা কেই সব বলতো,তারপর কি ভেবে খুব ধীরে ধীরে প্রশ্ন করে,”আচ্ছা মা তুমি বাবা কে কোনোদিনও ভালোবেসেছিল?তাহলে এতদিন ছেড়ে থাকলে কিকরে?কোনো খবরও নাওনি।”কিছুটা সময় নিয়ে ভাবেন তমশা,আন্দাজ করেন মেয়ের মনের ধোঁয়াশার কারণ।”যখন আমার মা আমার বিয়ে দেন আমার বয়স কুড়ি।মা এর মুখের ওপর কথা বলার ক্ষমতা ছিলোনা,কিন্তু জানতাম অখিলেশের মতো কেউ ভালো রাখতে পারতোনা।বিয়ের পর তোর বাবা কে খারাপ লাগেনি।একটু কম বুঝদার…ওর মা বাড়ির লোকের ওপর যে কোনো সিদ্ধান্তের জন্যে নির্ভরশীল।প্রথম ছমাস শুধু সম্পর্ক ছিল শরীরের।মন তখনও অখিলেশেরই ছিল।…তুই এলি।সমস্ত টান ভালোবাসা সবার জন্য সবটা শুধু তোর হয়ে গেল।…তোর বাবা কোনোদিনও কোনো অবস্থায় আমার পাশে দাঁড়ায়নি।কিন্তু যেদিন তোর দারকারেও পাশে এলোনা,সেদিন আমি ওকে ছাড়তে একমুহূর্ত ভাবিনি।…জানিস মিনু আমি চোখ বুজে তোকে নিয়ে আর ওকে ছাড়া নিজেকে কল্পনা করেছিলাম,এক অপার শান্তি মন ছুঁয়ে গেছিল।…কিন্তু কোনোদিনও একসাথে না থেকেও অখিলেশ চলে যেতে মনের একটা অংশ যেন ফাঁকা হয়ে গেল।”তমশার কথা শুনতে শুনতে একবার একটু কেঁপে উঠলো মৃন্ময়ী,তমশা সেটা লক্ষ্য করে হাত রাখলেন মেয়ের মাথায়।”ভালোবাসা আর অভ্যেস অনেক সময় গুলিয়ে যায় মিনু।চোখ বুজে সেই মানুষটাকে বাদ দিয়ে জীবনটা ভেবে দেখবি।যদি দেখিস শুধু সমস্যা মনে আসছে, বুঝবি সে তোর নিছক অভ্যেস।আর যদি বুকটা কেঁপে উঠে চোখ খুলে যায়,ছুটে গিয়ে তখুনি তাকে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছা করে বুঝবি তাকে ছাড়া তুই অসম্পূর্ণ।সে কোথাও ছিল,আছে আর থাকবেও।…নিজের মন বোঝা খুব শক্ত,কিন্তু যদি বুঝতে পারিস আর সেই মতো জীবনটা এগোতে পারিস বাকি জীবনের অর্ধেক সমস্যা কমে যাবে।আর হ্যাঁ যে তোকে ভালোবাসছে সেও কিন্তু ভালোবাসা চায় বলেই তোর কাছে এসেছে।কোনো কিছুই কিন্তু এক তরফা বেশিদিন টেকেনা।অনেকে ভালোবাসা মুখে প্রকাশ করতে পারেনা বাধ্য নাহলে,কিন্তু সবসময় তার নীরব উপস্থিতি বা তোর ওপর ভরসা তার গভীর ভালোবাসার প্রকাশ হয়।”তমশার কথায় মিনু চমকে উঠে তাকায়।মা কি তবে অন্য কিছু বলতে চাইছে,ইঙ্গিত দিচ্ছে কিছুর?!বোঝাতে চাইছে ওর না বলতে চাওয়া কথাগুলো?!মা তো তাই হয়তো সবটাই বোঝে।ফেরার পথে শেয়ার অটোতে না উঠে একটা অটো বুক করে মৃন্ময়ী।হঠাৎ কি ভেবে অটোয় বসে চোখ বুজে অনুভব করতে চায় দিশা ছাড়া জীবন…অনুভব করতে চায় নিজের ভালোবাসাহীন অনির্বাণ ছাড়া অন্য একটা বেটার জীবনকে।বুকের মধ্যেটা শুন্য হয়ে যায়,দম বন্ধ হয়ে আসে।হঠাৎ ভেসে ওঠে অন্ধকার ঘরে এলোমেলো বিছানায় চোখ বুজে পড়ে থাকা অনির্বাণের নিস্পন্দ শরীরটা,বিছানা থেকে ঝুলে থাকা হাত থেকে রক্ত পরে মেঝে ভেসে যাচ্ছে।….নিঃশ্বাস আটকে যায় মৃন্ময়ীর।চোখ খুলে ফেলে।চেঁচিয়ে ওঠাটা যাহোক করে সামলে নিয়ে অটোওয়ালা কে বলে,”ভাই ‘দিশা’ হাসপাতাল চেন?ওখানে চলো প্লিজ”।অবাক হয়ে অটোর কাঁচ দিয়ে ভদ্র মহিলাকে দেখে নিয়ে সে অটো ঘুরিয়ে নেয়,মুখে বলে,”টাকা কিন্তু বেশি লাগবে দিদি”।
দিশা-এর গেটে নেমে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পা চালিয়ে ডাক্তার চৌধুরীর চেম্বারে ঢোকে মৃন্ময়ী।দেখে ফাঁকা।অফিসে গিয়ে জানতে পারে স্যারের শরীর ভালো লাগছিলোনা বলে আজ একটু তাড়াতাড়ি কোয়ার্টারে চলে গেছেন।মৃন্ময়ী সময় নষ্ট না করে আবার পা চালায়।মিনুর বেলের আওয়াজে দরজা খোলে বাবুদা।কিন্তু মৃন্ময়ীর ওই উদ্ভ্রান্ত রূপ দেখে কিছু জিজ্ঞেস না করে অনির্বাণ ঘরে আছে বলে দরজা ছেড়ে সরে যায়।অনির্বাণ নিজের আরাম কেদারায় মাথা হেলিয়ে চুপ করে বসে আছে,গায়ে বাইরের পোশাক এখনো।মৃন্ময়ী নিঃশব্দে পায়ে পায়ে এগিয়ে যায়।হাঁটু গেড়ে বসে নিজের জীবনের প্রথম পুরুষের সামনে,হাঁটুর ওপর মুখ গুঁজে দেয়।অনির্বাণ চমকে চোখ খুলে দেখেন যাকে চিন্তায় আহ্বান করছিলেন,সেই ভালোবাসার মানুষটা তার কোলে মুখ গুঁজে দিয়েছে,আর তার পিঠটা চেপে রাখা কান্নার চেষ্টায় ফুলে ফুলে উঠছে।তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়িয়ে মিনুকে নিজের বুকে তুলে জড়িয়ে ধরেন তিনি।নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে আঁকড়ে ধরে বুকে মুখ গুঁজে কান্নায় ভেঙে পড়ে সবার সামনে কাঠিন্যের মুখোশ পড়ে থাকা মেয়েটা।অনির্বাণ দুহাত দিয়ে আরো গভীরভাবে জড়িয়ে ধরে খুব আস্তে অথচ জোর দিয়ে বলে,”আমি তো আছি তোমার সঙ্গে ,আর সব সময় তোমারই থাকবো…বোকা মেয়ে।”…গভীর আলিঙ্গনে একে অপরের সাথে মিশে এক হয়ে যায় দুজনে।

You may also like

Leave a Comment

error: Content is protected !!